পছন্দ-অপছন্দের উর্ধ্বে উঠে সৎ-দক্ষদের সেনা নেতৃত্বে আনার গুরুত্ব প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশিতঃ 10:02 pm | May 30, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:

পিতা মুজিবের মতোই দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও অবিচল আস্থা, গভীর বিশ্বাস আর ভালোবাসাও অকৃত্রিম। নিজের দু’সহোদর শেখ কামাল ও শেখ জামাল ছিলেন সেনাবাহিনীর দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তা। টানা তিন মেয়াদে দেশপ্রেমী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করেই নিরবচ্ছিন্নভাবে তিনি কাজ করে চলেছেন।

আরও পড়ুন: সশরীরে সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদের সভায় প্রধানমন্ত্রী (ভিডিও)

চারবারের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন এই সরকারের নিবিড় পরিচর্যায় শতভাগ পেশাদার, দক্ষ ও আধুনিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে সেনাবাহিনী। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় স্বমিহমায় উদ্ভাসিত ও গৌরবমন্ডিত এই বাহিনীর নির্বাচনী পর্ষদের অনুষ্ঠানে সবকিছুর উর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষ বিচার বিশ্লেষণ করে যোগ্য নেতৃত্বকে খুঁজে বের করার কার্যকর দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

দৃঢ়ভাবে বঙ্গবন্ধুকন্যা বিশ্বাস করেন- আনুগত্যসহ নেতৃত্বের জন্য দৃঢ় মানসিকতা, সততা এবং অন্যান্য গুণাবলীসম্পন্ন কর্মকর্তারা উচ্চতর পদোন্নতির জন্য যোগ্য। যাদের সামরিক জীবনে সফল নেতৃত্বের রেকর্ড রয়েছে এমন কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা উচিত।’

সোমবার (৩০ মে) সেনাবাহিনী সদর দপ্তরের সেনাসদর কনফারেন্স হল হেলমেট’এ চলতি বছরের সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদের সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত পছন্দের উর্ধ্বে উঠে সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের হাতে সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ন্যস্ত করতে বাহিনীটির সিনিয়র কর্মকর্তাদের নির্দেশনা প্রদান করেন। সরকারপ্রধান বলেন, ‘ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের উর্ধ্বে উঠে নেতৃত্বের জন্য পেশাদারি দক্ষতা, উৎকর্ষ, সততা ও দেশপ্রেম সম্পন্ন কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে হবে।

‘আপনাকে মনে রাখতে হবে যে, নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে পেশাদারভাবে দক্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন করা সম্ভব এবং আপনাকে পদোন্নতির জন্য উচ্চ নৈতিক চরিত্রের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং ন্যায়বিচারের সাথে দায়িত্ব পালন করবেন’ দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

শুধু তাই নয়, করোনাকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর জনকল্যাণমূলক নানা কাজেরও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন হ্যাট্টিক এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘কোভিড-১৯ মহামারীতে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ সবাই জনগণের দু:সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে বিশ্বব্যাপী দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রী সেনাসদরে এসে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ তাকে স্বাগত জানান।

সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব গোলাম মো: হাসিবুল আলম, সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান, কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইফুল আলম, এনডিসি কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো.আকবর হোসেন, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, আর্টডকের জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম মতিউর রহমানসহ সেনাবাহিনীর জেনারেল পদবীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পদ্মাসেতু নির্মাণে উজ্জ্বল হয়েছে দেশের ভাবমূর্তি
পদ্মাসেতু নির্মাণে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘নিজস্ব অর্থায়নে বহু প্রতিক্ষিত পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত বিশ্বের দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। বাঙালি জাতির আত্নবিশ্বাসও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী ২৫ জুন যান চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেয়া হবে।’

পদ্মাসেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধের সেই বিষয়টি উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘জনৈক ব্যক্তি পদ্মা সেতু প্রকল্পে মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগ আনায়- কোন বোর্ড মিটিং না করেই বিশ্বব্যাংক সেতুটি নির্মাণে অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল। যদিও পরে ওই অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছি, (বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জন করেছে) তা নিয়ে আমাদের আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে যেত হবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে এসব বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

বঙ্গবন্ধুর গতিশীল নেতৃত্বেই তিন মাসে মিত্রবাহিনী দেশে ফিরেছে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে বাংলাদেশই একমাত্র উদাহরণ যেখান থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে তিন মাসের মধ্যে মিত্র বাহিনী তাদের দেশে ফিরে গেছে। তৎকালীন পূর্ব (বর্তমানে বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিটি সেক্টরে বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানি সামরিক সার্ভিসে শুধুমাত্র একজন কর্নেল ছিলেন। তবে, এখন জেনারেলরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আছেন এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরপরই একটি উন্নত, পেশাদার ও প্রশিক্ষিত বাহিনী গড়ে তুলতে ১৯৭২ সালে কুমিল্লায় মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করেছিলেন। বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধুর প্রতিরক্ষা নীতি অনুসরণ করে ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ প্রণয়নের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অব্যাহত রেখেছে।’

সেনাবাহিনীকে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে হবে
‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনা মেনে সেনাবাহিনীকে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে হবে এবং তা ধরে রাখতে হবে’ গুরুত্বের সঙ্গেই এমন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খবর আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর)।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সৈনিকদের পেশাগত মান উন্নয়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করে শেখ হাসিনা বলেন তাঁর সরকার সেনাবাহিনীর সামগ্রিক উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ অব্যাহত রাখবে। ‘সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী ও সময়োপযোগী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাঁর সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে এবং উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে সেনাবাহিনীতে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম অন্তর্ভূক্ত করেছে।’

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ শুধু দেশের প্রতিরক্ষার কাজে নয় বরং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবিচ্ছেদ্য অংশীদার মন্তব্য করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘দেশের যেকোন দুর্যোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য সহযোগিতা করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পদ্মা সেতু ও পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পে নিরাপত্তা বিধান, তেল পাইপ লাইন প্রকল্প এবং করোনা মহামারী মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে জাতির আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনীতিতে যে মজবুত ভিত তৈরী হয়েছে তা ধরে রাখতে হবে।’

কালের আলো/এসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email