শক্তিশালী প্রশাসন গড়তে সরকারের চমক; দায়িত্বে দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তারাই

প্রকাশিতঃ 11:36 pm | May 19, 2022

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :

সততার পাশাপাশি সুচারুভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি) দক্ষতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়েছিলেন করপোরেশনের বিদায়ী নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী। ডিএসসিসির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস সেদিন তাঁর বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উচ্ছ্বসিত প্রশংসাই করেছিলেন।

ব্যারিস্টার তাপস বলেছিলেন, ‘এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী নিজের কাজের মাধ্যমে, দক্ষতার মধ্যমে ও কর্মতৎপরতার মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।’ এরপর ২০২১ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন আমিন উল্লাহ নূরী। এখানে দায়িত্ব পালনকালেই অতিরিক্ত সচিব থেকে সচিব হয়েছেন।

বুধবার (১৮ মে) তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। হয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব। ২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর থেকে এই পদে দায়িত্ব পালন করে আসা নজরুল ইসলামের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরীকে। রাজউকে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সব রকম সিন্ডিকেট ভেঙে দেন। বিবেকের কাছে জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী এই কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে দক্ষতা ও আন্তরিকতার দৌলতেই এই পুরস্কার পেয়েছেন।

সরকারের আস্থাভাজন সচিব হিসেবেই পরিচিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। নির্বাচন কমিশন দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে তাকে বসানো হয়েছিল স্থানীয় সরকার বিভাগে। ধারণা করা হয়েছিল তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাবেন। শেষ পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রথা থেকে সরে আসে সরকার। ফলত আগামী ২২ মে হেলালুদ্দীন পিআরএলে যাচ্ছেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হিসেবে এবার বেছে নেওয়া হয়েছে নবম ব্যাচের কর্মকর্তা, ফেনীর সন্তান নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দীন চৌধুরীকে। ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি এই মন্ত্রণালয় পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

সিলেট বিভাগীয় কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালনের সময় শ্রেষ্ঠ বিভাগীয় কমিশনার হিসাবে শুদ্ধাচার পুরস্কার পেয়েছিলেন। এক সময় সরকারের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা অভিজ্ঞ এই আমলা এখন সামলাবেন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ।

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ ও শক্তিশালী প্রশাসন গড়ে তুলতে সচিব পদে বড় রকমের রদবদলের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করেছে সরকার। বুধবার (১৮ মে) পাঁচজন সচিবের দপ্তর বদল করা হয়েছে। চারজন অতিরিক্ত সচিবকে সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। একজন সচিবকে জ্যেষ্ঠ সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ওইদিন এসব পদোন্নতি ও বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আর এই রদবদলে দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তাদের কাঁধেই দায়িত্বের গুরুভার অর্পণ করা হয়েছে।

সরকার একইভাবে কাজে গতি আনতে মাঠ প্রশাসনকেও ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। চাঁদপুর, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোণা জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিসকে ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোণা জেলায় ডিসি হিসেবে বদলী করা হয়েছে। বাদ বাকী তিন ডিসিকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে বদলী করা হয়েছে।

জানা যায়, স্থানীয় সরকার বিভাগের মতো স্বাস্থ্যসেবা বিভাগেও এবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়নি সেখানে দায়িত্বরত সচিব লোকমান হোসেন মিয়াকে। অতিমারী করোনায় যখন দেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে সেই সময় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নানকে সরিয়ে এই পদে দায়িত্ব দেয়া হয় লোকমান হোসেন মিয়াকে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না পাওয়ায় আগামী ১৪ জুন তিনি অবসরে যাচ্ছেন।

এই পদে তাঁর বিকল্প হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁর জেলা বরিশালেরই আরেক সন্তান ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদারকে। তিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। এর আগে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব ছিলেন।

তাকে সেখান থেকে সরিয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছিল। আনোয়ার হোসেন হাওলাদার ইতোপূর্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন খুলনা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনারও। লোকমান হোসেন মিয়াও সচিব হওয়ার আগে খুলনার বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আনোয়ার হোসেন হাওলাদারের দীর্ঘদিন বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগাতেই সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বেছে নেওয়া হয়েছে তাকে।

এক বছরের চুক্তিতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন নাজমানারা খানুম। আগামী ৮ জুন তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। খাদ্য সচিব হওয়ার আগে তিনি খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও ছিলেন। দ্বিতীয়বারের মতো তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মো. ইসমাইল হোসেনকে। অতিরিক্ত সচিব থেকে তিনি সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর তিনি খুলনার বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে যোগ দেন।

ভূমি মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগেও তিনি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। দীর্ঘ ২৮ বছর সরকারের সচিবালয় ও মাঠ প্রশাসনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা একাদশ ব্যাচের এই কর্মকর্তা চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবেও স্বনামে খ্যাত ছিলেন। ঢাকা জেলার এই সন্তান এবার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবেও নিজের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখবেন বলেই মনে করছেন তাঁর শুভাকাক্সক্ষীরা।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে মাহফুজা আখতারকে সরিয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম। সমাজকল্যাণ সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজের কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামালকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়েছে। আর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হাসানুজ্জামান কল্লোলকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েই ড.ফারহিনা আহমেদ ও হাসানুজ্জামান কল্লোল পদোন্নতি পেয়েছেন। নিজ নিজ দায়িত্বে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তাঁরা সক্ষম হবেন বলেও মনে করছেন অনেকেই।

একই দিনে অপর এক আদেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিছুর রহমান মিঞাকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আনিছুর রহমান। গাজীপুরের সন্তান বিসিএস একাদশ ব্যাচের এই কর্মকর্তা টাঙ্গাইল ও নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবেও সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। স্বচ্ছ ইমেজের এই কর্মকর্তা নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এই পদেও জনসেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

কালের আলো/বিএসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email