শেখ হাসিনার মুন্সীয়ানায় কূটনৈতিক অঙ্গণে সুদৃঢ় বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ 10:15 am | March 25, 2022

শেখ হাসিনার মুন্সীয়ানায় কূটনৈতিক অঙ্গণে সুদৃঢ় বাংলাদেশ

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে বাংলাদেশ। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ডাকা জরুরি বৈঠকে ভোটদানে বিরত থেকেছে দেশটি। ওই সময় থেকেই পশ্চিমা বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক মহল থেকে বাংলাদেশের ওপর নানামুখী চাপ এবং নিষেধাজ্ঞা আসার গুঞ্জণ তুঙ্গে উঠে।

এরই মধ্যে ঢাকা-ওয়াশিংটন অংশীদারি সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয় নতুন করে আর কোন নিষেধাজ্ঞা আসছে না। এমনকি র‌্যাবের তিন মাসের কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের সন্তোষের কথা জানানো হয়। এসবের পাশাপাশি গত তিনদিনের ব্যবধানে আরও দু’টি সুসংবাদ মিলেছে। যেটিকে বাংলাদেশের কূটনীতিতে বড় অর্জন হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

৪০ দেশের রাষ্ট্রদূত বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) পিতৃভূমি টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আবার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সহিংসতাকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছেন মহাপরাক্রমশালী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন।

দু’দিন আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘মধুর’ বলে জানিয়েছেন। ঢাকা-ওয়াশিংটন কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণজয়ন্তীতে আগামী এপ্রিলের শুরুর দিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফরও করবেন। এসব দিক থেকেও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল থেকে বেরিয়ে এসে জোরালো হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে জাতিসংঘের এবং ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্যপদ প্রাপ্তির মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ কূটনীতিতে বড় চমক দেখাতে সক্ষম হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের মুন্সীয়ানায় কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করে উন্নতির ধারা অব্যাহত রেখে কূটনীতির বড় এক চ্যালেঞ্জেও উত্তীর্ণ হয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় চমৎকার একটি ‘টিম ওয়ার্ক’ রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.এ কে আব্দুল মোমেন, প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফারুক খান এমপিসহ অন্যদের মাঝে।

বিশ্বের নানা দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উচ্চ পর্যায়ের সফরসহ বহুমুখী কূটনীতির প্রসার ঘটিয়েছে। বিদেশে বড় শ্রমবাজারও প্রতিষ্ঠা হয়েছে। রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানেও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কূটনৈতিক কোরের সদস্যরা। কূটনৈতিক কোরের ভারপ্রাপ্ত ডিন মরক্কোর মাজিদ হালিমের নেতৃত্বে ৪০টি দেশের রাষ্ট্রদূত বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের শহীদ সদস্যদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এক মিনিট নীরবতা পালন করেন অতিথিরা। শ্রদ্ধা নিবেদনের পরে ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ভারপ্রাপ্ত ডিন পরিদর্শন বইতে মন্তব্য লেখে স্বাক্ষর করেন। পরে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত স্বাক্ষর করেন।

এরপর রাষ্ট্রদূতরা বঙ্গবন্ধুর পৈত্রিক বাড়ি ও লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন। অতিথিরা সরকারি শেখ মুজিবুর রহমান কলেজে অনুষ্ঠিত লোকজ মেলা পরিদর্শন করেন। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফারুক খান এমপি ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাঁরাও এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।

এর আগে যাত্রাপথে ৪০ টি দেশের কূটনীতিক পদ্মা সেতু ঘুরে দেখে নিজেদের মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। বৃহস্পতিবারের (২৪ মার্চ) তাৎপর্যপূর্ণ এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গণে পুরোপুরি স্বস্তি ফিরে এসেছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন সঠিক পথেই রয়েছে বাংলাদেশের কূটনীতি। অনেকেই যখন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছেন বলে নানা বাহানায় নিজেদের মুখে তুবড়ি ছুটাচ্ছিলেন ঠিক সেই সময়ে বাঙালি জাতির চির আরাধ্য পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে ৪০ টি দেশের রাষ্ট্রদূতের বিনম্র শ্রদ্ধা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের জন্য বিজয় বার্তা।

বাংলাদেশের কূটনীতিক নীতি-অবস্থানের পক্ষে তাদের আস্থা বজায় রয়েছে প্রকারান্তরে এমন এক স্বীকৃতিও মিলেছে! অর্থাৎ, বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের সব রাষ্ট্রের কাছেই গ্রহণযোগ্য এটি পরিস্কার হয়েছে।

সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা এখনও আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গেই বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকার পরও রোহিঙ্গা সঙ্কটে তাদের সুদৃঢ় সমর্থন মিলেনি। আবার বিরোধীতাও করেনি। দেশ দু’টির সঙ্গে বাংলাদেশ ভালোভাবেই কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।

বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার মান্টিটস্কি বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘জাতিসংঘের জরুরি অধিবেশনে ভোটাভুটির আগে বাইরের প্রবল চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ নিরপেক্ষতা বজায় রাখায় আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

তিনি আশার বাণী উচ্চারণের মাধ্যমে দু’দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘রাশিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য কমানো নয়, বাড়াতে আগ্রহী।’ পশ্চিমা অনেক প্রতিষ্ঠান রাশিয়া থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশের অংশীদারদের জন্য বিরাট সুযোগ বলেই মনে করছেন আলেক্সান্ডার মান্টিটস্কি।

বাংলাদেশের ৫০ বছরের কূটনীতি মূল্যায়ন করে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের কূটনীতিতে অনেক ঈর্ষণীয় সাফল্য রয়েছে। তবে সাম্প্রতিককালে ভূ-রাজনীতির গোলকধাঁধার কারণে বাংলাদেশের কূটনীতি কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এশিয়ায় চীনের প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেটি মোকাবিলায় কোমর বেঁধে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র হিসাবে ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি।

আবার চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে এগোচ্ছে। দুই শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সামনে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ নিজ দেশের উন্নতি-অগ্রগতির প্রতি জোর দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্র নীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ নীতি বজায় রেখেছে।

এই নীতির কারণে কোনো বিশেষ পক্ষের প্রতি ঝুঁকে থাকা বাংলাদেশের প্রবণতা নয়। তবে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে বাংলাদেশের কূটনীতি সক্রিয় রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্ষমতাধর রাষ্ট্র মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো সহিংসতাকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে দিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ হলেই বাংলাদেশের কূটনীতির বড় এক বিজয় অর্জিত হবে।

কালের আলো/এসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email