‘সুরক্ষিত’ নৌকার ঘাঁটিকে ‘অরক্ষিত’ করতেই কী দীপু মনিকে নিয়ে ‘ষড়যন্ত্র’?

প্রকাশিতঃ 10:22 pm | March 04, 2022

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :

বারবার অপপ্রচারকেই উস্কে দেওয়া হচ্ছে! দৃশ্যমান এক পক্ষ। কিন্তু আড়ালে মূল কুশীলবরা। ইতোমধ্যেই ‘চিহ্নিত’ তাঁরাও। তিলকে তাল বানানো বা ফুলানো-ফাঁপানো; একদা গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে গালমন্দ করে মনগড়া নিবন্ধ লেখা সেই সাধুরা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটকে ঘিরেই ফের হন্তদন্ত! নৌকার ‘সুরক্ষিত’ দুর্জেয় ঘাঁটিকে ‘অরক্ষিত’ করতেই মতলববাজদের ‘মিশন চাঁদপুর’। ঘনঘোর অশুভ ছায়া নিয়েই পরিকল্পিতভাবে দেশের প্রথম নারী শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে ‘বিতর্কিত’ করার আড়ালে মূলত সরকারের ‘ইমেজ’ বিনষ্টেই দাপাদাপি; লাফালাফি।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির দাম নিয়ে ‘দুর্নীতি’ তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে দেশের সচেতন মানুষকে সন্দেহ- অবিশ্বাসের বাতাবরণের ঘূর্ণিপাকে কার্যত পাকপ্রেমকেই পুনর্বাসিত করার ঘৃণ্য চক্রান্তের ‘নীল নকশা’ চূড়ান্ত করা। ইনিয়ে বিনিয়ে মিথ্যার বেসাতি অপকৌশল গ্রহণের মাধ্যমে নৌকার ভোট ব্যাংককে ‘বগলদাবা’ করার চতুরতা, ফন্দিফিকির দিন যেতেই পর্দার আড়াল থেকে চলে আসে প্রকাশ্যে।

প্রতিবাদের ঝান্ডা নিয়েই উত্তাল চাঁদপুর স্বত:স্ফূর্ত জাগরণের মাধ্যমে হাতে হাত আর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিথ্যাচারের বিপরীতে রাজপথে তৈরি করলো বাঁধার প্রাচীর। কাঁপিয়ে দিয়েছিল ওয়ান ইলেভেনে ‘মাইনাস শেখ হাসিনা’ ফর্মুলা তত্ত্বের সেঁকোবিষ গেলানো চক্রের বুক। একই সঙ্গে খোন্দকারের মোশতাকের ভাবানুবাদে বিশ্বাসী ষড়যন্ত্রকারীদের কর্ণকুহরে পৌঁছে দিয়েছিল- ‘হৃদয়ে, চেতনায় আর গৌরব-অহংকারে’ নামাঙ্কিত ভাষাবীর এম এ ওয়াদুদের কন্যা, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি অকুতোভয়, আলোকবর্তিকার নাম। উন্নত-সমৃদ্ধ চাঁদপুরের কান্ডারি।’ অত:পর মুখ থুবড়ে পড়লো অপকৌশল। পাততাড়ি গুটিয়ে এখন তারা ব্যস্ত-সমস্ত নতুন কায়দা-কানুনে!

দীপু মনিকে নিয়ে মিথ্যাচারের রহস্যভেদ
২০০৮ সালের ভোটের আগে প্রায় ৩৫ বছর সদর ও হাইমচর উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁদপুর-৩ আসনটি হাতছাড়া ছিল আওয়ামী লীগের। জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটিতে ওই সময় ভোট বিপ্লব ঘটিয়ে জিতে আসেন ডা.দীপু মনি। এক সময় এই আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন এরশাদের জাপার সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত মিজানুর রহমান চৌধুরী। বারবার এখানে বিজয়মাল্য পড়েছেন ধানের শীষ’র প্রার্থীরা। আসনটি পুনরুদ্ধারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়ন দেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনিকে। রেকর্ড ভোটে জিতে তিনি আসনটি উপহার দেন বঙ্গবন্ধু কন্যাকে।

এর আগে নিরন্তর সংগ্রাম আর ‘ডোর টু ডোর’ কর্মপ্রবাহ সঞ্চালিত করে চাঁদপুর-৩ আসনটিকে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেন দীপু মনি। আওয়ামী লীগ সভাপতি দীপু মনিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। সমুদ্র জয়সহ দূরদর্শী কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের বিজয় কেতন উড়ান। প্রথমবারের মতো ভোট মিশনে জয়ের আগে নিজের নির্বাচনী এলাকার প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন নদীভাঙন। আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়ে দ্রুত সময়েই তিনি চাঁদপুর ও হাইমচরকে নদীভাঙন থেকে রক্ষায় প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চাঁদপুর ও হাইমচর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করেন। এরপর দু’টার্মে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রায় ১৩ বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে বঞ্চনার শেকলমুক্ত করেন চাঁদপুরকে।

তিলে তিলে, শ্রম-ঘামে নৌকার দুর্জয় ঘাঁটিতে পরিণত করেন চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলাকে। কেন্দ্রের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতেও হয়ে উঠেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের টানা চারবারের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। পরিকল্পিত উন্নয়নের সুবাতাস ছড়িয়ে স্থানীয় ভোটারদের কাছেও ডা.দীপু মনি হয়ে উঠেন শেষ কথা। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট দ্বারপ্রান্তে থাকায় ‘ক্লিন’ দীপু মনিকে ঠেকাতে শুরু হয়ে যায় ‘ব্যাক ডোর’ পলিটিক্স। এক স্রোতে সামিল হয় ওয়ান ইলেভেনের কুশীলব, দলীয় গুটিকয়েক ছদ্মবেশীরা। এই ফাঁদেই পা দেয় কিছু সরকারি কর্মকর্তারাও। ‘জার্সি বদল’ তত্ত্বে বিভোর হয়েই কীনা উত্থাপন করে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ, কান পাতলেই মিলছে এমন গুঞ্জন-গুঞ্জরণ।

সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক ডা: দীপু মনি ষড়যন্ত্রের অন্দর-বাহির ঠাহর করতে পেরে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পুরো বিষয়টিতে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। দিবালোকের মতোই পরিস্কার করে দেন তাঁর ভাই, চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ডা: জে আর ওয়াদুদ টিপু’র নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত জায়গায় কোন জমি না থাকলেও ঢালাওভাবে কাল্পনিক অভিযোগের তীর ছুঁড়া হয়েছে। সাফ সাফ জানিয়ে দেন চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে নির্ধারিত জায়গা থেকে তাঁর বা তাঁর পরিবারের বিন্দুমাত্র সুবিধা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

একই সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি তাঁর বড় ভাই ডা: জে আর ওয়াদুদ টিপুর পক্ষ থেকে একটি লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করে বিস্তৃত পরিসরে পুরো বিষয়টি আরও খোলাসা করেন। মন্ত্রী চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত করার কথা উচ্চারণের মাধ্যমে নিজের এবং পরিবারের নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় দেন।

মূলত আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে নৌকার দুর্জয় ঘাঁটিকে বিনষ্ট করতেই ঘাপটি মেরে থাকা ষড়যন্ত্রকারীরা উঁকি দিচ্ছেন নানান বাহানায়। চেনা সেই মুখরা অনেকবার ইমেজ সঙ্কটে ফেলেছেন দলকে। পরিশ্রমী, কর্মীবান্ধব দীপু মনির সঙ্গে মাঠে কুলিয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়ে দাপাদাপি শুরু করেছেন পেছনের দরজায়।

চক্রটির অসৎ উদ্দেশ্যের প্রথম কথা নিজেদের কাতারে স্বমহিমায় উজ্জ্বল একজন জাতীয় নেত্রীকে দাঁড় করোনার অপকৌশলের মাধ্যমে অস্তিত্ব সঙ্কটে খাবি খাওয়া একটি রাজনৈতিক দলের পারপাস সার্ভ করা। নিজেদের ডোনেশনে সরকারকে বিতর্কিত করা। এ যেন বেড়া ক্ষেত খাওয়া প্রবাদেরই অশনিসংকেত!

পুরনো সেই ক্ষোভ মেটানোর ‘ছক’
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রম তখন ক্রমশ পরিণত হয় সেমি মার্শাল ল’তে। শেখ হাসিনার পক্ষে কথা বললেই বিপদ হতে পারে এমন আশঙ্কায় রাজনীতি ও ক্ষমতার পদ-পদবি আঁকড়ে থাকা মানুষগুলো মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন। নীরব-নিথর চারপাশ। কারান্তরীণ প্রতিবাদের পুরুষকণ্ঠ। সেই সময়েই প্রতিবাদী ঝাণ্ডা হাতে রাজপথে শেখ হাসিনার মুক্তির পক্ষে আওয়াজ তোলেন ডা.দীপু মনিরা। অসীম সাহসে চরম ঝুঁকি নেন তাঁরা। তৈরি করেন বাঁধার প্রাচীর। ভেস্তে যায় শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস’ করার ষড়যন্ত্র।

সম্ভবত পুরনো সেই ক্ষোভ থেকেই চক্রটি শিক্ষামন্ত্রী ডা.দীপু মনির দিকেই নিজেদের নিশানা তাক করেছেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ কান্ডে মন্ত্রীকে জড়াতে একটি বিষয়কে ‘দুধে আলতা’ বানিয়ে নতুন করে রাঙানোর মাধ্যমে প্রকারান্তরে নিজেদের অসচ্ছতা, অনিয়ম ও স্বার্থান্বেষী মনোভাবকেই দিবালোকের মতোই স্পষ্ট করে তুলেছেন।

কেউ কেউ জানতে চেয়েছেন, এই চক্রটিই কী ওয়ান ইলেভেনে ‘মাইনাস শেখ হাসিনা’ ফর্মুলার রুপরেখা প্রস্তুতে পর্দার আড়ালের কুশীলব ছিলেন কীনা? ডা: দীপু মনিরা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই কীনা সেই পুরনো ক্ষোভ মেটানোর ছক কষা হয়েছে এখন পুরোদমে নতুন কায়দায়? এমন মতলববাজ, সাধু চক্রের উদ্দ্যেশ্যেই কীনা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের রচয়িতা, স্বনামে খ্যাত সাংবাদিক-কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী যথার্থই বলেছিলেন, ‘তাদের প্যাথলজিক্যাল হেট্রেট আছে আওয়ামী লীগের ওপর।’

কিন্তু একজন ডা.দীপু মনি একদিনে তৈরি হননি। ত্যাগ-সংগ্রাম আর ষড়যন্ত্রের কুহেলিকা জাল ছিন্ন করেই আপন মহিমায় তিনি পথ চলেছেন। পাড়ি দিয়েছেন অনেক বন্ধুর ও কন্টকাকীর্ণ পথ। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার স্নেহের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সততা ও আদর্শের তীব্র মানসিক শক্তিতে নিন্দুকের মুখে দিয়েছেন ছাই। তার ধমনীতে বহমান একজন ভাষাবীর ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এম এ ওয়াদুদের রক্ত। যিনি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীও। যিনি ঘৃণাভরেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বুটপড়া জিয়ার মন্ত্রীসভার লোভনীয় প্রস্তাব।

সেই রক্তের উত্তরাধিকার দীপু মনিকে ঘিরে তরুণ কবি কন্ঠে উচ্চারণ- ‘সততার সুশোভিত শিশিরবিন্দু আলো নিয়ে জন্মেছে এক বৈপ্লবিক রাণী/রয়েছে যার সততার অমূল্য ধন, মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ/সত্যের জন্য করেছে জীবন বিলীন, এ দেহে আছে যত দিন তার প্রাণ, সত্যের জন্য লড়াই করবে এটিই তাঁর কবিতা ও গান/তিনি করেছেন এমন জীবন গঠন, মরণের পরে সকলে অকাতরে করবে স্মরণ/দুর্নীতি নাশের তার রয়েছে উত্তপ্ত আগুন/সততার হৃদয়েতে করে ধারণ/শান্তি সুখ তাঁরে এসে,করে যে বরণ/কাজে কর্মে রয়েছে তাঁর সততার ছোঁয়া, আত্মবিশ্বাসের পাহাড়, কভু ফিরে তাকাতে হয় না নিন্দুকের অশোভন বাঁধায়/পর্বত শিখর নবোদয় সততার কাছে, পদাবনত হয়েছে মিথ্যার সকল ইন্দ্রজাল/সত্য মিথ্যার দ্বন্ধের মাঝে, সত্যের জয় সদা হয়/মিথ্যার সাথে চলতে গেলে জীবন হয় বিপন্ন, সততাই হোক আপনার জীবনের স্বপ্ন/এই আমাদের ঐকান্তিক কাম্য। তিনি আর কেউ নন,মেঘনা পাড়ের রাণী আমাদের সকলের চোখের মণি/স্বর্গে গেলেও তিনি হবেন শিক্ষামন্ত্রী আমাদের দীপু মনি।’

কালের আলো/এসবি/এমএম

Print Friendly, PDF & Email