রঙিন শহরে বেঁচে দেয়া জীবন

প্রকাশিতঃ 10:44 am | November 21, 2021

তুষার আবদুল্লাহ:

একটু অবসর বা আলস্য পেলে বিচিত্র শখ এসে মগজে কিলবিল করে। গতরাতে কাজ সেরে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলাম। ফুটপাত ধরে হাঁটছি, আমাকে দুদিক থেকে পেরিয়ে যাচ্ছে বাড়িমুখো মানুষ। হন্তদন্ত হয়ে ছুটছেন সবাই। অফিস বা কাজের জায়গা থেকে বেরিয়েও কারো মুক্তি মেলেনি। অসমাপ্ত কাজ বা আগামী দিনের কাজের সমন্বয়, হিসেব চুকাতে চুকাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে অনেককেই। পোশাক ও হাঁটার ধরনে বেশিরভাগই মধ্যম পর্যায়ের কর্মচারি। উচ্চমান সহকারী পর্যায়ের পদগুলো এখন কর্পোরেট জগতে এক্সিকিউটিভ, সিনিয়র এক্সিকিউটিভের মোড়ক লাগিয়েছে। অফিসের আলাপ, জটিলতা ছাড়াও সাংসারিক জট ছাড়াতেও বাড়ি মুখি মানুষ। সঙ্গে আছে বাহন সংকট।

পাঠাও, উবার, সিএনজি, বাস ধরতে গিয়ে বিড়ম্বনা। বাড়তি দুর্ভোগ যানজটতো আছেই। কর্পোরেট শ্রমিক ছাড়াও, কারখানার শ্রমিক ও অন্যান্য কতো মানুষকেই তো দেখছি। কেউ কেউ ফুটপাতের চায়ের দোকানে আড্ডায় মেতে আছে। সারাদিনের উদ্বেগ, বিষণ্ণতাকে বাষ্পিত করে নিচ্ছে বাড়ি ফেরার আগে। সবার মধ্যেই না পাওয়া ও নিষ্পেষণের ক্ষোভ আছে। কোন কোন আড্ডা থেকে উচ্ছ্বাস ভেসে আসছে। কাউকে হারিয়ে দেওয়ার আনন্দ, নিজে না পেলেও অন্য যে পেলো না, সেই আনন্দের উচ্ছ্বাস আরো রঙিন। এমন দুই একজনের কথা কানে এলো, যাদের কোন দুঃখবোধ নেই। তারা খুব জোটবদ্ধ নয়। কিছুটা অন্তঃমুখি। তবে নিজের স্বপ্নটাকে বাস্তবে রুপ দেয়ার জন্য লড়ে যাচ্ছেন। বাধা আছে, তবে কোন অভিযোগ নেই। জানেন দেরিতে হলেও জয় তাদের হবেই।

ফুটপাত ধরে হেঁটে যেতে যেতে চোখ যায় কফি শপ, পেষ্ট্রি শপের দিকে। উল্লাস ভরা জীবন সেখানে। খাবার, পানীয়ের মতো স্বাদু, সেখানে বসে থাকা মানুষ গুলোর যাপন। দল বেঁধে বসে আছে যেমন অনেকে, কেউ কেউ একাও বসে আছেন। জীবনের কতো কিছুর লেনদেন হয়ে যাচ্ছে সেখানে। জগতের কতো কঠিন সংকট এখানে তরল হয়ে যায়। হিসাবটা দেনা পাওনার। বিনিময় মূল্য ছাড়া কোন লেনদেন নেই এখানে। মুহূর্তেই অযুত অঙ্কের লেনদেন হয়ে যাচ্ছে ইশারায় বা স্রেফ করমর্দনে। কোন কোন দিন কারো শুধু অপেক্ষাতেই কেটে যায়। কাঙ্খিত মানুষের দেখা না পেয়ে। তবে এদের ধৈর্য আছে। অধ্যবসায় আছে। আজ না হোক কাল তো হবেই। তরুণ প্রবীণ সকল বয়সীই আছেন এই লেনদেনে। আজকাল এমন বৃত্তের মধ্যে নিজেকে সেঁটে না দিতে পারলে নাকি পিছিয়ে যেতে হয়। টাকা বা ক্ষমতার বিত্ত, কোনটিই ধরা দেয় না।

বুঝতে পারি একের এক কফি শপে ঢুঁ দিয়ে, এর সত্যতা। কফি শুধু উছিলা মাত্র। কফি তার ধর্মমতো বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। কেউ ইচ্ছে হলে দুই এক চুমুক দেয়ার করুণা দেখায়। আসলেতো সকলে সকলের চোখে খুঁজে বেড়ায় আশ্বাস, ভরসা, প্রতিশ্রুতি। বিনিময়টা যথাযথ হবেতো? যা দিলাম, যা দেবো তার ষোলআনা ফেরত আসবে তো। বিনিয়োগের ফিরতিটা দেরিতে আসুক ক্ষতি নেই। কিন্তু আসতে হবেই। এজন্যইতো বৃত্তে ঢুকার এই প্রাণান্ত চেষ্টা।

যে পথ ধরে হাঁটছি সেখানে টঙের দোকানের চেয়ে তারকা, অভিজাত হোটেল বেশি। সেখানেও ঢুঁ দেই। ফ্লোর জুড়ে ছড়ানো ছিটানো আড্ডা। বেচা কেনা চলছে। সবাই সবার কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। বিক্রি না হয়ে টেকা যায় না এ শহরে। এ সংসারে। কে কতো দামে বিক্রি হতে পারে সেই প্রতিযোগিতাই চলে। কতো মরচে ধরা লোহা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে হিরের দামে। হিরে বিক্রি হবে না গোঁ ধরায় মরচে ধরে অচল হয়ে যাচ্ছে।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবি, জন্ম থেকে এ শহরে আছি। মহল্লা, এলাকা যেমন রূপ পাল্টেছে। মানুষও কম বদলালো না। এক চেনা মানুষকেইতো কতো রঙ নিতে দেখলাম। রাজনীতি, ক্ষমতার সোডিয়াম আলোয়, এখন আর চেনা মানুষের আসল রঙ দেখতে পাই না। চিনতেও পারি না। এই অক্ষমতা আমাকে না দিলো বৃত্ত না দিলো বিত্ত।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

Print Friendly, PDF & Email