পুলিশের প্রশংসায় প্রধানমন্ত্রী, উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় নিজেদের সহযাত্রী মনে করেন আইজিপি

প্রকাশিতঃ 3:38 pm | September 11, 2019

বিশেষ প্রতিবেদক, কালের আলো :

পুলিশকে আধুনিক ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনেক সীমিত শক্তির মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশকে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষকে কাঙ্খিত সেবা দেওয়ায় পুলিশের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন তিনি। একই সঙ্গে দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের মাধ্যমে স্থাপিত হওয়া দৃষ্টান্ত সবাইকে অনুসরণ করারও নিদের্শনা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড.মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীও সমৃদ্ধির অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বগুণ, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, ‘দেশের এ অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ পুলিশ এক সহযাত্রী।’

বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের মালকানাধীন কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ’র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্যে আবারো পুলিশ বাহিনীর প্রতি নিজের প্রগাঢ় আন্তরিকতারই বহি:প্রকাশ ঘটান প্রধানমন্ত্রী।

কনস্টেবল নিয়োগের দৃষ্টান্ত সবাইকে অনুসরণের নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘পুলিশে নিয়োগের ক্ষেত্রে ঘুষ দুর্নীতির একটি বদনাম ছিল। পুলিশ সেখানে এবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ঘুষ, দুর্নীতিমুক্তভাবে যেভাবে নিয়োগ হয়েছে অতি সাধারণ পরিবারের গরিব ছেলে-মেয়েরা চাকরি পেয়েছেন। প্রত্যেকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করে বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সকলের এ বিষয়টি অনুসরণ করতে হবে।’

জনবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জনগণ পুলিশের কাছ থেকে যেন স্বল্প সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পুলিশ গড়ে তোলা হচ্ছে। পুলিশের সেবা তাৎক্ষণিক পেতে জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ চালু করা হয়েছে। পুলিশ খুব দক্ষতার সঙ্গে এক্ষেত্রে কাজ করছে।’

‘বাংলাদেশ পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে নতুন প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, জনবল বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে সরকার, যার সুফল এরইমধ্যে দেশের জনগণ পেতে শুরু করেছেন’ বলেও জানান হ্যাট্টিক প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মাদক দমনে বাংলাদেশ পুলিশের দক্ষতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। পুলিশ এক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে এক্ষেত্রে নারী পুলিশ সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হচ্ছে। ’

‘মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এক্ষেত্রে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে। কারণ, মাদক একটি পরিবার ও সমাজকে নষ্ট করে দেয়।’

‘দেশে আন্দোলনের নামে যেভাবে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা হয়েছে, সেভাবে পুলিশের ওপরও হামলা হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা যেভাবে জনগণের সেবা করছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়’ যোগ করেন এ সরকার প্রধান।

দেশের অগ্রযাত্রার সহযাত্রী পুলিশ
বাংলাদেশ কমিউনিটি ব্যাংকের বিষয়ে ভিডিও প্রেজেন্টেশন উপস্থাপনকালে শুরুতেই পুলিশ প্রধান ড.মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, বিপিএম (বার) বিন¤্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর তেজদীপ্ত আহবানেই শুরু হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।

কালজয়ী এ আহ্বানে উজ্জীবিত হয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাজারবাগের নির্ভীক পুলিশ সদস্যরা পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করেন তা ছড়িয়ে পড়েছিল সারাদেশে, সর্বসাধারণের মাঝে। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় আমাদের প্রাণের স্বাধীনতা।’

পুলিশ প্রধান বলেন, ‘অনেক ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার পথে আমরা আবারো আমাদের অগ্রযাত্রা শুরু করেছি। বর্তমান সরকার দেশের অর্থনীতিকে একটা শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে নিরন্তর কাজ করে চলেছে।

ইতোমধ্যে সরকার গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের ফলে উন্নয়নের সকল সূচকে আমাদের অগ্রগতি শাণিত হয়েছে। বিগত ১০ বছরের ব্যবধানে আমাদের দেশের মানুষের ক্রয় ক্ষমতা, মাথাপিছু আয় ও জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে যাচ্ছে।’

অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ়তর হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসকল উন্নয়নের পেছনে রয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা।’

যে কোন দেশের কাঙ্খিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে স্থিতিশীল ও নিরাপদ আইনশৃঙ্খলা অন্যতম প্রধান শর্ত বলেও মন্তব্য করেন আইজিপি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জঙ্গি, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলে বাংলাদেশ পুলিশের কার্যক্রম জনমনে আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করেছে।’

ড.মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার ঐকান্তিক স্বদিচ্ছায় ২০০০ সালে বাংলাদেশ পুলিশ কল্যান ট্রাস্টের ভিত্তি রচিত হয়। আপনার নির্দেশে ও স্বপ্রণোদিত আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে এই ট্রাস্টের যাত্রা শুরু হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ কল্যান ট্রাস্ট, পুলিশের দুই লক্ষাধিক সদস্য ও তাদের পরিবারের কল্যানে চিকিৎসা সহায়তা, শিক্ষাবৃত্তিসহ অন্যান্য সেবামূলক কার্যক্রমে আর্থিক অনুদান প্রদান করে আসছে। সময়ের চাহিদায় কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের কল্যানের বিস্তৃতি ও দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির চাকাকে বেগবান করার জন্য বাংলাদেশ পুলিশ কল্যান ট্রাস্ট একটি ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আসছিল।

২০১৬ সালে পুলিশ সপ্তাহে আপনার নিকট পুলিশ কল্যান ট্রাস্টের মাধ্যমে একটি ব্যাংক গঠনের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। আপনি আমাদের ঐকান্তিক ইচ্ছার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে এ আবেদন মঞ্জুর করেন। এবং তা বাস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।’

অনুষ্ঠানে পুলিশের এ সর্বোচ্চ কর্মকর্তা বলেন, ‘কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়নের জন্য ফেব্রুয়ারি ২০১৭ থেকে জানুয়ারী ২০১৮ পর্যন্ত পুলিশ এবং নন পুলিশ সদস্যদের হতে কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত জনপ্রতি ২৭ হাজার টাকা করে পরিশোধিত মূলধন হিসেবে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়।

এই ব্যাংক হতে প্রতিটি পুলিশ সদস্য যেমন একটি নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ পাবে তেমনি সহজ শর্তে গৃহঋণ, গাড়ি, মোটরসাইকেল, গৃহস্থালি ঋণ ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিপরীতে ঋণসহ অন্যান্য ব্যাংকিং সুবিধা পাবে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য করতে চাই, পুলিশ সদস্যদের গৃহনির্মাণ, সন্তানদের শিক্ষাসহ অন্যান্য নানাবিধ সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে পারিবারিক স্বচ্ছলতা আনতে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করছি, যোগ করেন ড.জাবেদ পাটোয়ারী।

এ দিনটিকে বাংলাদেশ পুলিশের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গৌরবের জানিয়ে আইজিপি বলেন, ‘পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি জনগণের দৌড়গোড়ায় বিশ্বমানের ব্যাংকিং সেবা পৌছে দেওয়ার লক্ষ নিয়ে আজকে ব্যাংকটির আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।

প্রত্যেক শ্রেণিপেশার জনগণের জন্য যুগোপযোগী ব্যাংকিং সেবার মান নিশ্চিতকরণ ও গ্রাহকদের আমানতের সর্বোচ্চ সুরক্ষা প্রদানের মাধ্যমে কমিউনিটি ব্যাংক আর্থিক খাতে অচিরেই অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে বলে আমরা আশা করছি।’

প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্বে সমৃদ্ধির অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল এবং বাংলাদেশ পুলিশ এই অগ্রযাত্রার এক সহযাত্রী বলে মনে করেন পুলিশ প্রধান। তিনি বলেন, ‘সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের।

রূপকল্প ২০২১ ও রুপকল্প ২০৪১ এর লক্ষ্য অর্জনে ইতোমধ্যেই আমরা উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জন করেছি। আর্থিক খাতে বর্তমান সরকারের যে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশে পুলিশ কল্যান ট্রাস্টের সফলতায় নতুন সংযোজন কমিউনিটি ব্যাংক নি:সন্দেহে উন্নয়নের সে ধারাকে আরও বেগবান করবে।’

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি, অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল এমপি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব ড. মুস্তফা কামাল। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব মো. নজিবুর রহমান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী মো. আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভুইয়া, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিদায়ী কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া, র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এএ/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email