দালালে প্রতারিত হয়ে বামাকোতে, সফলতার উদাহরণ সেই সালাহ উদ্দিন (ভিডিও)

প্রকাশিতঃ 6:18 pm | September 05, 2019

অ্যাক্টিং এডিটর, কালের আলো, বামাকো (মালি) থেকে :

নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে স্বপ্নের দেশ ইতালি যেতে চেয়েছিলেন ১৫ বছর বয়সী সালাহ উদ্দিন। বাবার জমি জিরাত বিক্রির সেই টাকা দালাল হাতিয়ে নিলেও তাঁর আর ইউরোপের মাটি স্পর্শ করা হয়নি। যখন তাকে বিমানে উঠানো হয়েছিল তখনো তিনি ভেবেছিলেন বামাকো হয়তো ইতালিরই কোন নগরী। কিন্তু দুর্ভাগ্য!  

আরও পড়ুন: ঢাকা থেকে আকাশযাত্রায় বিশ্বের সবুজ বিমানবন্দর ইস্তাম্বুলে

পশ্চিম আফ্রিকার মালির রাজধানী বামাকোতেই তাকে নামিয়ে চম্পট দিলো দালাল। সব হারিয়ে নি:স্ব তরুণ বাধ্য হয়েই আশ্রয় নিলেন এখানকার এক মসজিদে। বাংলাদেশ থেকে প্রতারিত হয়ে আসা এ কিশোরের অসহায়ত্বে মন গললো মসজিদের ইমামের। এরপর প্রথমে সিগারেটের দোকান এবং পরবর্তীতে একটি মার্কেটে দারোয়ানের কাজ নিলেন। রাতে ঘুমানোর জন্য মসজিদের পরিবর্তে এবার ঠাঁই হলো মার্কেটের সিঁড়িতে।

কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের হাতছানিতে আবারো ভুল করে বসলেন। শ্রম-ঘামে অর্জিত জমানো কিছু টাকায় এবার আলজেরিয়া যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু আবারো পাশের গাঁও শহরের মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে অবৈধ পথে ভূমধ্যসাগরের তীরের ওই দেশের পথে পা বাড়ান। বিধি বাম! ধরা পড়লেন। সঙ্গী ১৫ থেকে ২০ জন অভিবাসী।

আরও পড়ুন: বামাকো শহরে সড়কে নেই বিশৃঙ্খলা, রাজত্ব ছোট যানের

চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হলো তাদের। গুলিতে মারা পড়লেন ক’জন। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও তিন মাস কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে দিন কাটলো। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আর কোন দু:সাহসিক অভিযাত্রায় নিজেকে সামিল না করে কিশোর সালাহ উদ্দিন ফিরে এলেন গাঁও শহরে।

আরও পড়ুন: মাঝারি উড়োজাহাজে নাইজার হয়ে বামাকোতে

সেখানেই পরিচয় হলো গাঁও শহরের পুলিশ কমান্ডার ওমার সি’র ছেলের সঙ্গে। বন্ধুত্বের সুযোগে সেখানেই মাস দুয়েক থাকার সুযোগ হলো। দুরন্ত এ কিশোর সিদ্ধান্ত নিলেন বামাকোতেই থিতু হওয়ার। আবারো শুরু হলো নতুন জীবন সংগ্রাম।

আরও পড়ুন: বামাকোতে মিঠেকড়া রোদের পর তুচ্ছাতিতুচ্ছ বৃষ্টি!

চায়ের দোকানে কাজ করে আয়ের টাকায় সিডির দোকান দিলেন বামাকো শহরে। হঠাৎ দেখা হলো সেই পুলিশ কমান্ডারের ছেলের সঙ্গে। জানালেন তাঁর ছোট বোন সাজু সি পড়াশুনা করেন বামাকোর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। কোন প্রয়োজনে যেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এরপর তাঁর সঙ্গে পরিচয়, প্রেম-প্রণয় থেকে সংসার। সাজু সি ছিলেন এখানকার জাতীয় বাস্কেটবল খেলোয়াড়।

নানা ঘাটে বাঁক নেওয়া জীবন সংগ্রামের বয়ান এভাবেই কালের আলো’র কাছে যেন একদমেই বলে যাচ্ছিলেন মালিতে প্রথম বাংলাদেশী সালাহ উদ্দিন খান (৩২)। বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের শ্রীনগরে তাঁর বাড়ি। বাবা ইলিয়াস উদ্দিনের ৫ সন্তানের একজন তিনি।

প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির সমীকরণ মেলাতে গিয়ে অবর্ণনীয় কষ্টে ঘূর্ণিপাকের পর এখন জীবন বদলেছে সেই সালাহ উদ্দিনের। বামাকোতে এখন সালাহ উদ্দিনের জুতা-কাপড়ের দু’টি দোকান। স্ত্রী ও ৪ সন্তান নিয়ে ২০ হাজার টাকা ভাড়ায় থাকেন। দোকান ভাড়া বাবদও মাসিক গুণতে হচ্ছে বাংলাদেশী টাকায় আরো ৪০ হাজার টাকা।

ভাগ্য অন্বেষণে ইতালি বা আলজেরিয়ার পরিবর্তে বামাকোতে ১৯ বছর কাটিয়ে তৃপ্তির হাসি তাঁর মুখায়বজুড়ে। কিন্তু সত্যি সত্যিই স্বাচ্ছন্দ্যময় এমন জীবনের নেপথ্যে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান। ২০১৩ সাল থেকে মালিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ।

এখানকার উর্ধ্বতন এক সেনা কর্মকর্তা জানতে পারেন ভাগ্য বিড়ম্বিত সালাহ উদ্দিনের কথা। তাঁর দূর্বিসহ জীবনের গল্প শুনে আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য সহযোগিতা করেন। এতে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেন এ হতভাগ্য তরুণ।

সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ানো শুরু। বামাকো শহরে এখন দু’টি জুতা-কাপড়ের শো রুমের মালিক সালাহ উদ্দিন। সেইদিনের সেই সংগ্রামী সালাহ উদ্দিনের সফলতার গল্পও এখন এখানকার মানুষের মুখে মুখে।

কালের আলোকে সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমি বোনাস জীবন পেয়েছি। অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে মৃত্যুর সময়েও বাবাকে দেখতে বাড়ি যেতে পারিনি। এখন আমার সব হয়েছে। কিন্তু আমার সফলতা বাবা দেখে যেতে পারেননি’ আক্ষেপ সালাহ উদ্দিনের কন্ঠে।

টানা ১৫ বছর পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে দূরে থাকা সালাহ উদ্দিনকে প্রথম দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ২০১৫ সালে দেশ থেকে ঘুরে এসেছেন তিনি। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমার, স্ত্রী ও ৪ সন্তানের ভিসা থেকে শুরু করে বিমানের টিকিট সবকিছুই ব্যবস্থা করে দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।’

দৃঢ় ও আত্মপ্রত্যয়ী সালাহ উদ্দিনের অন্যতম বড় মানসিক তৃপ্তি বেঁচে থাকা মমতাময়ী মায়ের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পাওয়া। সালাহ উদ্দিন জানান, তাঁর মা ও এক ভাইয়ের ভরণ-পোষণের খব খরচই তিনি বহন করেন। প্রতি মাসে তাদের জন্য বাড়িতে টাকা পাঠান।

স্ত্রী ও ৪ সন্তান খাদিজা খান (৯), সাবিনা খান (৭), নাদিম খান (৬) ও শেখ ওমর তিজান খানকে (২) নিয়ে সুখের সংসার সালাহ উদ্দিনের। স্বামী বাংলাদেশী হওয়ায় স্ত্রী-সন্তানরাও আস্তে আস্তে রপ্ত করছে রক্তের দামে কেনা বাংলা ভাষা। গর্বিত সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। দেশের জন্য কিছু করতে চাই।’

সালাহ উদ্দিন নেতৃত্ব দিচ্ছেন মালিতে বাংলাদেশী কমিউনিটির। রয়েছেন এ সংগঠনের সভাপতি হিসেবে। তাঁর ভাষ্য মতে, ‘১৯ বাংলাদেশী রয়েছেন এ সংগঠনে।’ তিনি জানান, মালিতে উৎপাদিত তুলা রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশে। গত দুই মাসে দুই ধাপে ৫ হাজার ও ১০ হাজার মেট্টিক টন তুলা বাংলাদেশে রপ্তানি করেছেন।

মালিতে বাংলাদেশী পোশাকের বাড়তি কদর রয়েছে। এ নিয়েও যেন নতুন স্বপ্ন বুনছেন তিনি। সালাহ উদ্দিন কালের আলোকে বলেন, ‘মালির বাজারে চাহিদা অনুযায়ী তৈরি পোশাক আমদানি করতে পারলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।’  

কালের আলো/কেএএই/এমএএএমকে

Print Friendly, PDF & Email