ভোট সংগ্রামে জয়ী শীতল সরকার, ১৮ বছর পর ফিরছে স্ত্রী লক্ষী!

প্রকাশিতঃ 11:57 am | May 07, 2019

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো :

ভোটে তাঁর জয় যেন ‘অধরা’। প্রায় তিন যুগ যাবত ভোট করছেন। একবার জয়ের বন্দরে নোঙর ফেলেও পাননি জয়ের দেখা। ভোটই তাঁর কপাল পুড়িয়েছে! করেছে ‘চাল-চূলোহীন’!

মান-অভিমানে বাড়ি ছেড়েছেন প্রিয়তমা জীবনসঙ্গী, সঙ্গে সন্তানও। তবুও পিছপা হননি একজন শীতল সরকার।

শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছেন, আস্থা কুড়িয়েছেন ভোটারের। ময়মনসিংহ পৌরসভায় টানা ৬ বার হারের ‘ডাবল হ্যাট্টিকে’র পর সপ্তম বারের পদক্ষেপে কাঙ্খিত সাফল্য ধরা দিয়েছে তাঁর ভুবনে।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন (মসিক) নির্বাচনের প্রথম ভোটে ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে অবশেষে কাউন্সিলর হওয়ার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছেন ষাটোর্ধ্ব শীতল সরকার।

ভোট ভাগ্যকে জয় করা এ অশীতিপর বৃদ্ধ এখন হয়ে উঠেছেন নগরীর ‘হিরো’। অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছেন। আশেপাশের ওয়ার্ডের লোকজনও ভিড় করছেন একনজর তাকে দেখার জন্য।

সোমবার (০৬ মে) রাতে কালের আলো’র সঙ্গে আলাপে হাসিমুখে শীতল সরকার জানালেন সুসংবাদ। ১৮ বছর পর নগরীর কালিবাড়ী রোডের সেই ‘ছাদনাতলায়’ ফিরছেন তাঁর স্ত্রী লক্ষী সরকার। ফিরছে একমাত্র আদুরে সন্তান হিমেল সরকারও।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন (মসিক) নির্বাচন শেষে এখন নগরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন শীতল সরকার। তাকে নিয়ে জল্পনার যেন শেষ নেই।

পুরো বিষয়টি উপভোগ করছেন। হাসিমুখে জবাব দিচ্ছেন। আর হবেই বা না কেন? ১৮ বছর পর সুখ নামের ‘সোনার হরিণ’ আবারো ধরা দিয়েছে তাঁর আপন ভুবনে।

ভোট সংগ্রামী শীতল সরকারের জীবনের গল্প শুনতে কথা বলে কালের আলো। ‘১৯৮১ সাল থেকে কমিশনার পদে ভোট শুরু করেছিলাম। তখন আমার বয়স ২৬ কী ২৭ বছর। ভরা যৌবন থেকেই কাউন্সিলর হতে সংগ্রাম করছি।

৬ বার পৌরসভায় এ পদে প্রার্থী হয়েছি। একবার ২ হাজার ৯’শ ভোট পেয়েও অল্পের জন্য হেরে গেছি। মন খারাপ করিনি। কারণ আমার বিশ্বাস ছিলো আমার ওয়ার্ডের সাধারণ ভোটাররা একদিন আমাকে মূল্যায়ন করবেন।

আজ আমি মূল্যায়িত হয়েছি’ বলতে বলতেই আবেগী হয়ে উঠলেন শীতল সরকারের কন্ঠস্বর।

৪৬ বছর ‘দ্বার পরিগ্রহ’ করেননি ভোট পাগল শীতল সরকার। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে ‘সাতপাকে’ বাঁধা পড়েন জামালপুরের সরিষাবাড়ী শিমলার বাসিন্দা লক্ষী সরকারের সঙ্গে।

কিন্তু স্বামীর পুরো হৃদয়-মন অধিকার করে আছে ভোট। ভোটের জন্য সহায় সম্বল সব হারিয়েছেন। তবুও লক্ষ্যচ্যুত হননি।

মান-অভিমানের জেরে এক পর্যায়ে স্ত্রী লক্ষী ২০০১ সালের দিকে স্বামীকে ছেড়ে পাড়ি জমালেন বাপের বাড়িতে। যাওয়ার বেলায় না কী বলে গেলেন, ‘কোনদিন নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে আমাকে আনতে যেও’।

বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করতেই শীতল সরকারের সোজাসাপ্টা জবাব-‘আসলে আমার ধ্যানজ্ঞান ছিলো ভোট। স্ত্রী অভিমান করেছে। এখন তাঁর অভিমানও ভেঙেছে।

আমার একমাত্র সন্তান জামালপুরে একটি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। সিটি কাউন্সিলর পদে শপথের পর পরই স্ত্রীকে আমার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো। আমার জয়ে স্ত্রী-সন্তান মহাখুশি।’

স্বামী-স্ত্রী আলাদা হলেও নিয়মিতই যোগাযোগ ছিলো তাদের। ছেলে হিমেল সরকারেরও নিয়মিত দেখভাল করেছেন। শ্বশুরালয়ে যাওয়া-আসাও ছিলো।

তবে এবার স্ত্রী’র পুরোপুরি মান ভেঙেছে। ভোটের আগে প্রতিনিয়তই তাঁর উৎসাহ পেয়েছি’ সংযোজন করে বলেন শীতল সরকার।

নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া হলফনামা মতে, শীতল সরকার মাধ্যমিক পাস। পেশায় ব্যবসায়ী। এ খাত থেকে তাঁর বছরে আয় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। হাতে নগদ আছে ৬০ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদ বলতে নেই কিছু।

প্রসঙ্গত, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের (মসিক) ৯ নম্বর ওয়ার্ডে শীতল সরকার মিষ্টি কুমড়া প্রতীক বিজয়ী হয়েছেন ২ হাজার ২৬১ ভোট পেয়ে। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আল মাসুদ ১ হাজার ৬৫৯ ভোট।

কালের আলো/এএএমকে

Print Friendly, PDF & Email