নব আনন্দে জাগে বৈশাখের আবহমান জয়গান

প্রকাশিতঃ 1:40 am | April 14, 2019

বিশেষ প্রতিবেদক, কালের আলো:

বৈশাখ আসে প্রতিবছর- চির নতুনের বার্তা নিয়ে। বৈশাখের সেকাল-একাল, অতীত বর্তমান সংস্কৃতির এক সুবর্ণ রেখা। সেকালের বৈশাখ-বড় বেশি নষ্টালজিক। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বৈশাখ ছুঁয়ে যায় প্রাণ।

নবপ্রাণে, নব আনন্দে জাগে বৈশাখের আবহমান জয়গান। এক সময়কার গ্রামীণ উৎসব এখন ছুঁয়ে যায় নগর জীবনকেও। শাণিত করে সবার হৃদয়-মনকে।

১৪২৫ তম বৈশাখে হাজার বছরের বাংলা তার ঐতিহ্যকে ধারণ করে নতুন সময়ে প্রবেশ করছে। পেছনে ফেলে রেখে এসেছে সর্বশেষ আরেকটি বছর। কালের যাত্রাপথে এই অবিরাম বাংলার মুখ অনিন্দ্য সুন্দর।

তবে বঙ্গাব্দ ১৪২৫ বছর আগে প্রথম বৈশাখ ছিল না। শুরুটায় রয়েছে এক দীর্ঘ বিমূর্তকাল। বাংলা সন শুরুতেই উদযাপন করে ৯৬৩ বছর। যার সূচনা করেছিলেন মোঘল সম্রাট আকবর।

গ্রেগারিয়ান বর্ষ ১৫৮৪ সালের ১০/১১ মার্চ থেকে প্রথমে ফসলী সন, অতঃপর বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ। প্রজন্মের ভাবনায় বৈশাখ এক নতুন উদ্দীপনা, আপন সত্ত্বায় উদ্ভাসিত।

স্মরণাতীত কাল থেকে পহেলা বৈশাখ বাংলার কৃষি প্রধান সমাজের দৈনন্দিন জীবনের এক সাংবার্ষরিক অধ্যায়। সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনে বৈশাখ শুরুতে উৎসব হয়ে আসেনি।

একটা দীর্ঘ সময়জুড়ে বৈশাখ এক ঐতিহ্য বিনির্মাণ করেছে; কৃষি সংস্কৃতির আবহকে এগিয়ে নিয়েছে। কালান্তরে তা বাঙালির প্রাণের উৎসব, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে…!

এরই মধ্যে বর্ষবরণের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে নানা আচার-অনুষ্ঠান। যা বাঙালি বেশ আয়োজন করে পালন করে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা:

জীর্ণতাকে পিছে ফেলে, সাফল্য-ব্যর্থতার সালতামামিতে বৈশাখ মানুষকে নতুনভাবে জাগ্রত করে। হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে বাঙালির মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন বিশ্বমানের। বিশ্ব ঐতিহ্যও বটে।

বলা চলে, বিশ্বের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। এই নান্দনিক ঐতিহ্য শুধু জীবনাচারের কথা বলে না, সম্মিলিত মানুষের জীবনবোধের প্রতীকও।

ঐতিহ্যের এই শোভাযাত্রায় কথা বলে শ্রেণি-পেশার লোক সংস্কৃতি এবং কৃষ্টির উপাখ্যান। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও কোনো কোনো সময় ওঠে আসে বর্ণিল ওই শোভাযাত্রায়।

সেই নব্বইয়ের দশক থেকে বৈশাখের প্রথম প্রভাত থেকেই মঙ্গল শোভাযাত্রা হচ্ছে সংস্কৃতির এই নগরীতে।

রাজধানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়ে থাকে। যশোরে এই শোভাযাত্রার শুরু হলেও শুরুর পর থেকে প্রতিবছরই এর আয়োজন করা হচ্ছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের নগরী ময়মনসিংহেও।

নগরীর মহারাজা রোড এলাকার মুকুল নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে গিয়ে শেষ হবে জয়নুল উদ্যানের বৈশাখী মঞ্চে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আমীর আহমেদ চৌধুরী রতন জানান, অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা- এই প্রত্যয়ে ময়মনসিংহেও বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রা থাকছে। এই ঐতিহ্য দিয়ে পৃথিবী থেকে সকল মন্দকে বিদায় ও ভালোকে আহ্বান জানানো হয়।

নতুন বছরে শুভ কামনা নিয়ে জেলার ত্রিশাল উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বের হবে অন্যতম বৃহৎ মঙ্গল শোভাযাত্রা।

বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়োজনে এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে।’ এই শোভাযাত্রার সার্বিক দায়িত্বে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। আর এর প্রধান মোটিফ হিসেবে থাকছে ‘ময়ূরপঙ্খী নাও’।

‘নির্বাসনে’ হালখাতা উৎসব:

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখে এখানকার নগর কী গ্রাম থেকে যেন রীতিমতো নির্বাসনে গেছে হালখাতা উৎসব। সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী হালখাতা।

তবে এখনও ময়মনসিংহের বড় বাজার ও মেছুয়া বাজারের কিছু ব্যবসায়ী হালখাতার রীতি এখনও ধরে রেখেছেন।

ময়মনসিংহ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহ-সভাপতি ও ব্যবসায়ী শঙ্কর সাহা বলেন, হালখাতা বর্ষবরণ উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করে। এক সময় সব ব্যবসায়ী পুরাতন বছরের হিসাব নিকাশ চুকিয়ে নতুন বছরের টালি খুলতেন, কিন্তু এখন কালের পরিক্রমায় তা আর নেই। তবে কিছু ব্যবসায়ী এখনও এটি ধরে রেখেছেন।

গ্রাম্য মেলা

বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ গ্রাম্য মেলা। বলা যায় এটি সার্বজনীন লোকজ মেলা৷ বাংলা নতুন বছরের শুরুতে দেশের সর্বত্রই আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার৷ নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে এ বৈশাখী মেলা৷

মেলায় স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী ছাড়াও সব ধরনের হস্তশিল্প ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী মেলার মূল আকর্ষণ৷ গ্রামের তুলনায় শহরেও এখন আয়োজন করা হয় এই মেলার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ময়মনসিংহে বর্ষবরণ উৎসব ও মঙ্গল শোভাযাত্রা ছাড়াও মেলার আয়োজন করা হয়। আর এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা করেছে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সিটি করপোরেশন।

আয়োজনের সার্বিক বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের (মসিক) প্রশাসক ইকরামুল হক টিটু বলেন, ‘আমরা বাঙালি, এটিই বাঙালির জীবনে বৈশাখের প্রধান বার্তা। জাতির গৌরব, সমাজ সংসারের চালচিত্র আমাদের জীবনে নববর্ষ নিয়ে আসে এক নতুন বার্তা। যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে আমাদের সভ্যতার মহিমাকে গৌরবোজ্জ্বল করে তোলে।

কালের আলো/ওএইচ

Print Friendly, PDF & Email