প্রশ্নফাঁস ঠেকিয়ে ‘পরীক্ষায় উত্তীর্ণ’ শিক্ষামন্ত্রী!

প্রকাশিতঃ 10:15 am | April 05, 2019

বিশেষ প্রতিবেদক, কালের আলো :

সমস্যার গোড়ায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছিলো না। নিরাময় করতে চিহ্নিত করা যাচ্ছিলো না প্রশ্নফাঁসের ক্ষত। ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে রীতিমত বিজ্ঞাপন দিয়ে, মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে প্রশ্নফাঁসের কথা জানানো হতো। বেগতিক পরিস্থিতিতে ফেসবুক বন্ধের মতো ‘তুঘলকি’ কান্ডও ঘটানো হয়েছিলো।

চারিদিকে ঝড় উঠেছিলো বিতর্কের। সংসদেও উঠেছিলো শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি। মন্ত্রী প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতকে ধরিয়ে দিতে ৫ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উল্টো গত এক দশকে শিক্ষায় রেকর্ড সাফল্য অর্জন করা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছিলো প্রশ্নফাঁস ক্ষতে।

আরো পড়ুন: আলোকময় উজ্জ্বল ভবিষ্যত উপহারে শিক্ষার মানোন্নয়নে নজর শিক্ষামন্ত্রী’র

এমন প্রেক্ষাপটে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ‘হ্যাট্টিক’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন মাল্লা নিয়ে ঐতিহাসিক নবযাত্রা শুরু করলেন। মন্ত্রীসভা গঠনে ‘মহাচমক’ তৈরি হয়। বাদ পড়েন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও। নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বেছে নেন নবম জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ডা: দীপু মনিকে।

দেশের প্রথম এই নারী শিক্ষামন্ত্রীর সামনে শুরুতেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছিলো মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ঠেকানো। মন্ত্রী সমস্যা চিহ্নিত করে এর মুলোৎপাটনেই নজর দিলেন। প্রযুক্তি বন্ধ করে সমাধানের পথে না হেঁটে প্রযুক্তি দিয়েই তিনি প্রযুক্তিকে মোকাবেলা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

প্রথমে মাধ্যমিক এবং পরবর্তীতে চলমান উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও প্রশ্নফাঁস ‘ঠেকিয়ে’ দিয়েছেন ইলিশের রাজধানীর বাসিন্দা এই মন্ত্রী। ফলে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে সফলতার সঙ্গেই উত্তীর্ণ হয়েছেন জাতির পিতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ভাষাবীর ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এম এ ওয়াদুদের এই কন্যা।

আরো পড়ুন: ১২০ দিনে কী ‘অর্জন’ প্রথম নারী শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি’র?

অবশ্য প্রশ্নফাঁস ঠেকানোর এই কৃতিত্ব শিক্ষামন্ত্রী নিজেকে নয়, দিয়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ ও মন্ত্রণালয়ের সবাইকে। সামনের দিনগুলোতেও টিম স্পিরিটের মাধ্যমেই বড় বড় আরো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিতে চান মন্ত্রী।

‘এসএসসি আমাদের সবার জন্যই পরীক্ষা’ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে চট্টগ্রামে জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা প্রতিযোগিতার উদ্বোধনকালে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন এমন কথা। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘আগামী ২ ফেব্রুয়ারি থেকে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে।

এটি আমাদের সবার জন্যই পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় আমরা সবাই যেন ভালোভাবে উত্তীর্ণ হতে পারি। সেই পরীক্ষা যেন হয় সম্পূর্ণভাবে প্রশ্নফাঁসমুক্ত ও নকলমুক্ত।’ অনৈতিকতার পথে হেঁটে কখনও ভালো ফলাফল পাওয়া যায় না এবং প্রশ্নফাঁস রোধে সরকার কঠোর অবস্থা নিয়েছে বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন ডা: দীপু মনি।

ডা. দীপু মনি চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসন থেকে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগের দিন শেরপুরের নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা রাজলক্ষ্মী উচ্চবিদ্যালয়ে দুই দিনব্যাপী শতবর্ষপূর্তি ও পুনর্মিলনী উৎসবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে সরকার সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। গোয়েন্দা তৎপরতা ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ফলে প্রশ্নফাঁসের কোন সুযোগ নেই।’

আশাবাদী শিক্ষামন্ত্রী সোমবার (১ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, প্রশ্নফাঁস ছাড়াই এইচএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। শুধু প্রশ্নফাঁস ঠেকিয়েই নয়, শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষা পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনার কথা বলেছেন মন্ত্রী।

শিক্ষামন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বলেছিলেন, শিক্ষার মান উন্নত করার চ্যালেঞ্জ সারা বিশ্বে আছে। সে চ্যালেঞ্জ অর্জনে আমরা কাজ করে যাবো। কোনও সমালোচনা থাকলে গুরুত্ব সহকারে নেব।’

ডা: দীপু মনি বিশ্বাস করেন একজন শিক্ষার্থীকে শুধু ভালো ফলাফল করলেই হবে না দেশপ্রেমও থাকতে হবে তাঁর মাঝে। মন্ত্রী বলেন, ‘ব্যক্তি জীবনে রাজনীতি না করলেও রাজনীতি সচেতন হতে হবে। অনেক মূল্যে কেনা এ দেশে স্বাধীনতাবিরোধী ও নারী বিদ্বেষীদের আশ্রয় হতে পারে না।

শিক্ষামন্ত্রীর এলাকার বাসিন্দা জীবন কানাই চক্রবর্তী। চাঁদপুরের প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মনে করেন, শুধু প্রশ্নফাঁস ঠেকানোই নয়, ডা. দীপু মনির হাত ধরে শিক্ষার গুণগতমান প্রসারে বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা কল্যাণ সমিতির সভাপতি নাজমুল ইসলাম কালের আলোকে বলেন, ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে গত ১০ বছরে শতভাগ সাক্ষরতার হার ও শিক্ষায় গুণগত মান উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পসহ নীতিমালা প্রণয়ন ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে এক্ষেত্রে সাফল্যের প্রশংসা করেছে ইউনেস্কো।

কিন্তু এরপরও প্রশ্নফাঁস ছিলো আমাদের গলার কাঁটা। শিক্ষামন্ত্রী এটিকে প্রথমেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। আমরা বলবো এখন পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী এক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। তিনি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সাধনও করতে পারবেন।’

কালের আলো/এএ

Print Friendly, PDF & Email