‘লন্ডনে বসে নাটাই ঘুরায়, ধরে এনে রায় কার্যকর করব’

প্রকাশিতঃ 7:13 pm | December 22, 2018

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

বিএনপির মনোনয়ন প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ওই লন্ডনে বসে বসে নাটাই ঘুরায়, যে একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। আল্লাহ যদি দিন দেয়, ওই সাজাপ্রাপ্ত আসামি ধরে এনে বাংলাদেশে রায় কার্যকর করব। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলতে দেব না।’

শনিবার সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় এসব কথা বলেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘নির্বাচনে তারা (বিএনপি) কী করেছে? একেক সিটে তারা ৪-৫ জন করে নমিনেশন দিয়েছে। একেকটা সিট অকশনে দিয়েছে। যে যত টাকা দেবে, সে নমিনেশন পাবে। এ অকশনে দিতে গিয়ে তাদের ছ্যাড়া-ভেড়া অবস্থা।’

ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে স্বাগত

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা জানেন এই সিলেটে ইনাম আহমেদ চৌধুরী, তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। আমি তাকে স্বাগত জানাই। তিনি নিজে বলেছেন, একেকজনের কাছে টাকা চায়, দিতে পারলে আছে, দিতে না পারলে নমিনেশন নেই। এই হলো তাদের মনোনয়ন, তারা অকশন দিয়েছে। আপনারা বলুন, এরা কী রাজনীতি করে? রাজনীতি করে না।’

এ সময় মঞ্চ থেকে সিলেট বিভাগের ৪ জেলার ১৯টি আসনে মহাজোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন জোট নেতা শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘এই বাংলাদেশ সারা বিশ্ব থেকে যে সম্মান অর্জন করেছে, সে সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব। বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে গেলে সম্মান পায়, সে সম্মান রক্ষা করতে হবে আপনাদের। তাহলে কী করতে হবে? একটাই কাজ করতে হবে। সে জন্য সিলেটবাসীর কাছে আমি আবারও এসেছি। আমি আপনাদের কাছে নৌকা মার্কায় ভোট চাই, নৌকায় ভোট দিয়ে আমাদের প্রার্থীকে জয়যুক্ত করবেন।’

পিতার হত্যাকারীদের প্রতীকে নির্বাচন

এ সময় হবিগঞ্জ-১ আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এম এস কিবরিয়া পুত্র রেজা কিবরিয়ার সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘যেখানে বিএনপি কিবরিয়া সাহেবকে হত্যা করেছে, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো সেই কিবরিয়া সাহেবের ছেলে আজকে বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে ইলেকশন করছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ নির্বাচনে আমরা নৌকা মার্কায় ভোট চাই। কারণ নৌকা মানে উন্নয়ন। ধানের শীষ মানে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, লুটপাট, জঙ্গিবাদ, অগ্নিসন্ত্রাস। তারা স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের নমিনেশন দিয়েছে। যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে আমরা শাস্তি দিয়েছি। তাদেরকে নিয়ে নির্বাচনে অংশীদার হয়েছে। তারা দেশের ক্ষমতায় আসা মানে দেশকে ধ্বংস করবে। সব অর্জন নস্যাৎ করবে, কারণ এরা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই নৌকা মার্কা। এ নৌকা হচ্ছে মানুষের দিন বদলের বন্ধু। এ নৌকায় ভোট দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ পেয়েছে স্বাধীনতা, পেয়েছে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার।’

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সারা বিশ্বে উচ্চ আসনে নিয়ে গেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেই উচ্চ আসনটা ধরে রাখতে হবে। ওই বিএনপি জামায়াত জোট বাঙালি জাতির মান সম্মান ভুলণ্ঠিত করেছিল। হত্যা, খুন, অগ্নিসন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি –এটাই ছিল তাদের কাজ।’

সারাদেশে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও সিলেটের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের কওমি মাদরাসা, এ কওমি মাদরাসার কোনো সরকারি স্বীকৃতি ছিল না। আমরা দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমর্যাদার করে দিয়েছি। আজকে আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ, বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলতে চাই। আমরা যেই সম্মান পেয়েছিলাম বাংলাদেশ স্বাধীন করার পর, সেই সম্মান নষ্ট করা হয় পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে।’

বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতা বর্ণনা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাদের (বিএনপি) অপকর্মের কারণে ২০০৭ সালে ইমার্জেন্সি ঘোষণা হয়। ২০০৮ সালে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। আজকে বলে বাংলাদেশ মানে উন্নয়ন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দিনরাত পরিশ্রম করে এ মর্যাদা আমরা আপনাদের জন্য বয়ে এনেছি। এ দেশকে আমরা গড়ে তুলতে চাই, উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ হিসেবে।’

‘আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা যে প্রার্থী দিয়েছি, তাদের জন্য নৌকা মার্কায় ভোট চাইতে আমি আপনাদের কাছে এসেছি,’ বলেন শেখ হাসিনা।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লুৎফুর রহমানের সভাপতিত্বে জনসভা সঞ্চালন করেন মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক সিটি মেয়র বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান।

জনসভায় আরও বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সিলেট- ৬ আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নুরুল ইসলাম নাহিদ, দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

এর আগে শেখ হাসিনার আগমণকে কেন্দ্র করে সিলেট মহানগরী শহর মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। সভামঞ্চের আশপাশে এসে মিছিলগুলো সমবেত হয়। দুপুর ১২টার পর থেকে সভাস্থলে প্রবেশের অনুমতি পায় মিছিলগুলো। সকাল থেকে সিলেট মহানগরীর অলিতে-গলিতে সরকারের উন্নয়ন চিত্র নিয়ে গান, মাইকিং ও বিভিন্ন দেশাত্ববোধক গান বাজিয়ে রিকশা মাইক নিয়ে ঘুরতে দেখা যায়। দুপুর পর্যন্ত মহানগরীর আশপাশের এলাকা থেকে বাদ্য বাজিয়ে সভাস্থলে আসতে থাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। জনসভার স্থান ছোট হওয়ায় আশপাশের সড়কে অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য শোনেন দলটির নেতাকর্মীরা।

নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে আসতে থাকে। পুরো শহর জুড়েই নৌকা প্রতীকের পোস্টারের পাশাপাশি স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে শেখ হাসিনা ও সরকারের ১০ বছরের উন্নয়ন নিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন গান বাজতে থাকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে। শহরে দেয়াল লিখনের পরিমাণ কিছু কম থাকলেও পোস্টার ছিল চোখে পড়ার মতো। মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা শহরের বিভিন্ন পথ প্রদক্ষিণ করতে দেখা যায়।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিলেট সফরকে কেন্দ্র করে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেখা গেছে নগরজুড়ে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স ছাড়াও পুলিশ, র‌্যাবসহ অন্যান্য বাহিনী কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনি তৈরি করেন।

এর আগে সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে হযরত শাহ জালাল (রহ.), হযরত শাহ পরাণ (রহ.) ও হযরত গাজী বোরহান উদ্দিন (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন তিনি। এরপর সার্কিট হাউসে জোহরের নামাজ, মধ্যাহ্ন ভোজ ও বিশ্রাম শেষে বেলা ৩টার দিকে নৌকার আদলে তৈরি মঞ্চে পৌঁছান আওয়ামী লীগ সভাপতি।

কালের আলো/এএ/এমএইচএ

Print Friendly, PDF & Email